কারুনের ধবংসের কাহিনী
কারূন ও তার ঘরবাড়ি ধ্বসিয়ে ফেলার ঘটনা জীবন চরিত লেখক ও ঐতিহাসিকগণ এটাই উল্লেখ করেছেন-
হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বনী ইস্রাঈলকে সমুদ্র তীরে নিয়ে যাবার পর ‘মাযবাহ্’ (পশু যবেহের স্থান) এর নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বভার হযরত হারূন (عَلَیۡهِ السَّلَام) কে সোপর্দ করলেন। বনী ইস্রাঈল আপন ক্বুরবানীসমূহ হযরত হারূন (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর নিকট নিয়ে আসতো আর তিনি সেগুলো যবেহ্খানায় রাখতেন। আসমান থেকে আগুন নেমে এসে সেগুলো খেয়ে ফেলতো। কারূন হযরত হারূন (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর উক্ত পদবীর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েছিলো। সে হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) কে বললো, “রিসালাত তো আপনার সৌভাগ্য হয়েছে। আর ক্বুরবানীর নেতৃত্ব হযরত হারূনের হাতে। আমার তো কিছুই রইলো না; অথচ আমি তাওরীতের উৎকৃষ্টতর পাঠক হই। এতে আমার ধৈর্য হচ্ছেনা।” হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বললেন, “এ পদটা তো হারূন (عَلَیۡهِ السَّلَام) কে আমি দেইনি, আল্লাহ তা'আলা-ই দিয়েছেন ।” কারূন বললো, “আল্লাহরই শপথ! আমি আপনার কথা সত্য বলে গ্রহণ করবো না, যতক্ষণ না আপনি এর প্রমাণ আমাকে দেখাবেন।” হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বনী ইস্রাঈলের নেতৃবর্গকে একত্রিত করে বললেন, “তোমরা তোমাদের লাঠিগুলো নিয়ে এসো।” সে গুলোর সবটিই তিনি আপন হুজরার মধ্যে জমা করে রাখলেন। সারা রাত ব্যাপী বনী ইস্রাঈল ঐ লাঠিগুলোকে পাহারা দিতে লাগলো। ভোরে দেখা গেলো যে, হযরত হারূন (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর লাঠি তরুতাজা হয়ে গেলো। তা থেকে কচি পাতা বের হয়ে আসলো। হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বললেন, “হে কারূন! তুমি কি এটা দেখছো?” কারূন বললো, “এটা আপনার যাদু বৈ আশ্চর্যজনক কিছুই নয়। হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) তার প্রতি সদ্ব্যবহার করতেন; কিন্তু সে সব সময় তাঁকে কষ্ট দিতো। আর তার অবাধ্যতা ও অহংকার এবং হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর প্রতি শত্রুতা দিন দিন বাড়তে লাগলো।
সে (কারূন) একটা বাড়ি তৈরি করলো। সেটার দরজা ছিলো স্বর্ণের তৈরি। দেয়ালের উপর স্বর্ণের পাত স্থাপন করলো। বনী ইস্রাঈল সকাল-সন্ধ্যায় তার নিকট আসতো খানা খেতো। নতুন নতুন কথা রচনা করতো এবং তাকে হাসাতো।
যখন যাকাতের নির্দেশ অবতীর্ণ হলো, তখন কারূন হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর নিকট আসলো। তখন সে নিজেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলো যে, সে দিরহাম, দীনার ও গৃহপালিত পশু ইত্যাদি থেকে হাজার হাজার অংশ যাকাত দেবে। কিন্তু ঘরে গিয়ে হিসাব করে দেখলো যে, তার মোট সম্পদের ততটুকু অংশও পরিমাণে অনেক ছিলো। তার রিপু এতটুকু দিতেও সাহস করলো না।
আর সে বনী ইস্রাঈলকে একত্রিত করে বললো, “তোমরা মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর প্রত্যেক কথাকে মান্য করছো। এখন তিনি তোমাদের সম্পদ নিতে চাচ্ছেন। এ ব্যাপারে তোমাদের অভিমত কি?” তারা বললো, “আপনি আমাদের মধ্যে বড়। আপনি যা চান নির্দেশ দিন।” সে বললো, “অমুক দুশ্চরিত্রা
নারীর নিকট যাও। আর তার জন্য একটা বিনিময়-মূল্য নির্ধারণ করো। সুতরাং সে মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে।” এমনটি করা সম্ভব হলে বনী ইস্রাঈল হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) কে বর্জন করবে।”
সুতরাং কারূন ঐ নারীকে হাজার স্বর্ণমুদ্রা (আশরাফী) ও হাজার টাকা এবং বহুধরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ অপবাদ দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। পরদিন বনী ইস্রাঈলকে একত্রিত করে হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর নিকট আসলো আর বলতে লাগলো, “বনী ইস্রাঈল আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন!
আপনি তাদেরকে কিছু ওয়াজ-নসীহত করুন।”
হযরত তাশরীফ নিয়ে আসলেন। অতঃপর বনী ইস্রাঈলের সমাবেশে দন্ডায়মান হয়ে তিনি বললেন, “হে বনী ইস্রাঈল! যে চুরি করবে তার হাত কেটে ফেলা হবে। যে কারো বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করবে, তাকে আশিটা চাবুক মারা হবে, যে যিনা করবে, তার যদি স্ত্রী না থাকে তবে তাকে একশত চাবুক মারা হবে, আর যদি স্ত্রী থাকে তবে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে।”
কারূন বলতে লাগলো, “এ নির্দেশ কি সবার জন্য? চাই আপনিও হোন না কেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যদি আমিও হইনা কেন।” সে বলতে লাগলো, “বনী ইস্রাঈলের ধারণা যে, আপনি অমুক দুশ্চরিত্রা নারীর সাথে যিনা করেছেন!” হযরত সায়্যিদুনা হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বললেন, “তাকে ডেকে আনো।” সে আসলো। অতঃপর হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বললেন, “তাঁরই শপথ, যিনি বনী-ইস্রাঈলের জন্য সমুদ্র দ্বি-খন্ডিত করেছেন এবং তাতে রাস্তা করে দিয়েছেন আর তাওরীত অবতীর্ণ করেছেন! সত্য কথাই বলে দে।”
তখন ঐ নারী ভয় পেয়ে গেলো এবং আল্লাহর রসূলের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে তাঁকে দুঃখ দেয়ার দুঃসাহস তার হলো না। সে মনে মনে ভাবলো, “এর পরিবর্তে তাওবাহ করে নেওয়াই শ্রেয় হবে।” অতঃপর সে হযরত হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর দরবারে আরয করলো, “যা কিছু কারূন আমার দ্বারা বলাতে চাচ্ছে, আল্লাহ্ মহাসম্মানিত, মহামহিমের শপথ! তা মিথ্যা এবং সে আপনার বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপের বিনিময়ে আমার জন্য বহু অর্থ-নির্ধারণ করেছে।”
হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) আপন প্রতিপালকের দরবারে ক্রন্দনরত অবস্থায় সাজদাবনত হলেন আর এই আরয করতে লাগলেন, “হে আমার প্রতিপালক! যদি আমি তোমার রসূল হয়ে থাকি, তাহলে আমারই কারণে তুমি কারূনকে শাস্তি দাও।”
আল্লাহ তা'আলাতাঁর প্রতি ওহী প্রেরণ করলেন- “আমি যমীনকে আপনার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছি। আপনি তাকে যা চান নির্দেশ দিন!”
হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) বনী ইস্রাঈলকে বললেন, “হে বনী ইস্রাঈল! আল্লাহ তা'আলা আমাকে কারূনের প্রতি প্রেরণ করেছেন যেমন ফিরআ’উনের প্রতি প্রেরণ করেছিলেন। যে কারূনেরই সাথী হবে, সে যেন তার সাথেই তার স্থানে স্থির থাকে। আর যে আমার সাথী হবে, সে যেন তার নিকট থেকে পৃথক হয়ে যায়।”
সমস্ত লোক কারূনের নিকট থেকে পৃথক হয়ে গেলো এবং মাত্র দু’জন লোক ছাড়া কেউ তার সাথে রইলো না। অতঃপর হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) যমীনকে নির্দেশ দিলেন যেন তাদেরকে গ্রাস করে নেয়। তখন তারা হাঁটু পর্যন্ত ধ্বসে গেলো। অতঃপর তিনি একই নির্দেশ দিলেন। তখন কোমর পর্যন্ত ধ্বসে গেলো। তিনি এভাবে নির্দেশ দিতে রইলেন। ফলে, তারা ঘাড় পর্যন্ত ধ্বসে গেলো। তখন তারা বহু কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো এবং কারূন তাঁকে আল্লাহর বিভিন্ন শপথ ও আত্মীয়তার বন্ধনের দোহাই দিচ্ছিলো; কিন্তু তিনি সে দিকে দৃষ্টিপাতই করেননি। শেষ পর্যন্ত, তারা সম্পূর্ণরূপেই ভূ-গর্ভে ধ্বসে গেলো আর ভূ-পৃষ্ঠ সমতল হয়ে গেলো।
হযরত ক্বাতাদাহ বলেন যে, তারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত ধ্বংসতেই থাকবে।
বনী-ইস্রাঈল বললো, “হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) কারূনের প্রাসাদ, তার ধন-ভান্ডার ও ধন-সম্পদের কারণে তার বিরুদ্ধে বদ-দুআ’ করছেন।” এ কথা শুনে তিনি আল্লাহ তা'আলার দরবারে দুআ’ করলেন। অতঃপর তার প্রাসাদ, ধন-ভান্ডার এবং সম্পদও ভূ-গর্ভে ধ্বসে গেলো। ( তাফসীরে খাজাইনুল ইরফান,সূরা ক্বাসাস,আয়াতঃ৮১)।

No comments