মুসা নবীর দোয়ায় ফির'আউনীদের উপর আল্লাহর গজবসমূহ
অতঃপর আমি প্রেরণ করেছি তাদের উপর প্লাবন পঙ্গপাল, ঘুণ (অথবা كلنی অথবা উকূন), ব্যাঙ এবং রক্ত। পৃথক পৃথক নিদর্শনসমূহ ; অতঃপর তারা অহংকার করলো এবং তারা অপরাধী সম্প্রদায় ছিলো।(সূরা আ'রাফ,আয়াতঃ ১৩৩)।
_______
যখন যাদুকরগণ ঈমান আনার পরও ফির‘আউনের অনুসারীগণ তাদের কুফর ও অবাধ্যতার উপর অটল থেকে যায়, তখন তাদের উপর আল্লাহর নিদর্শনসমূহ একের পর এক আসতে লাগলো। কেননা, হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) দুআ’ করেছিলেন, “হে প্রতিপালক! ফির‘আউন দুনিয়ার মধ্যে অত্যন্ত অবাধ্য হয়ে গেছে এবং তার সম্প্রদায় অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে, তাদেরকে এমন শাস্তিতে লিপ্ত করুন, যার তারা উপযোগী হয় এবং আমার সম্প্রদায় ও পরবর্তীদের জন্য শিক্ষা হয়।”
তখন আল্লাহ তা'আলা প্লাবন (তুফান) প্রেরণ করলেন। মেঘ এলো। অন্ধকার হয়ে গেলো। প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হতে লাগলো। ক্বিবতীদের (ফির‘আউনের সম্প্রদায়) ঘরগুলো পানিতে ভর্তি হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত তাদের তাতে দন্ডায়মান হয়ে থাকতে হলো এবং পানি তাদের গলার হাড় পর্যন্ত উঠে গিয়েছিলো; তাদের মধ্যে যারা বসা ছিলো তারা নিমজ্জিত হলো। না এদিক সেদিক নড়াচড়া করতে পারতো, না কোন কাজ করতে পারতো। এক শনিবার থেকে পরবর্তী শনিবার পর্যন্ত সাত দিন যাবত এই মুসিবতের মধ্যে লিপ্ত রইলো। বনী ইসরাঈলের ঘর তাদের ঘরের সাথে সংলগ্ন থাকা সত্ত্বেও তাদের ঘরে পানি ঢুকেনি। যখন এসব লোক ক্লান্ত হয়ে গেলো তখন তারা হযরত মূসা ( عَلَیۡهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام) এর নিকট আরয করলো, “আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন যেন এ মুসিবত অপসারিত হয়।
তখন আমরা আপনার উপর ঈমান আনবো। আর বনী-ইসরাঈলকে আপনার সাথে প্রেরণ করবো।”
হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) প্রার্থনা করলেন। প্লাবনের মুসিবত অপসারিত হলো। দুনিয়ায় এমনই সজীবতা আসলো, যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। ক্ষেত ভালোই হলো। বৃক্ষগুলো ভালো ফল দিলো। তখন ফির‘আউনের সম্প্রদায় বলতে লাগলো সে-ই পানি তো নি’মাত ছিলো আর ঈমান আনলোনা।
একটা মাস শান্তিতে অতিবাহিত হলো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ‘পঙ্গপাল’ প্রেরণ করলেন। সেগুলো ক্ষেত-ফসল ও ফল-মূল, গাছের পাতা, ঘরের দরজা, ছাদ, তক্তা এবং অন্যান্য সামগ্রী এমনকি লোহার পেরেক পর্যন্ত খেয়ে ফেললো এবং ক্বিবতীদের ঘর ভর্তি হয়ে গেলো। (কিন্তু) বনী-ইসরাঈলের ঘরে প্রবেশ করলোনা।
আর ক্বিবতীগণ পেরেশান হয়ে আবার হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর নিকট দুআ’র প্রার্থনা করলো; ঈমান আনার অঙ্গীকার ঘোষণা করলো। এর উপর দৃঢ় অঙ্গীকার করলো। সাত দিন, অর্থাৎ শনিবার থেকে পরবর্তী শনিবার পর্যন্ত পঙ্গপালের সংকটের মধ্যে লিপ্ত রইলো। অতঃপর হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর দুআ’ প্রার্থনার কারণে রক্ষা পেলো। (কিন্তু) তারা ক্ষেত ও ফল-মূল যা কিছু অবশিষ্ট রইলো তা দেখে বলতে লাগলো, “এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা আমাদের ধর্ম (!) ত্যাগ করবো না।” সুতরাং তারা ঈমান আনলোনা। অঙ্গীকার পূরণ করলো না এবং নিজেদের গর্হিত কাজেই লিপ্ত হয়ে থেকে গেলো। এক মাস শান্তিতে অতিবাহিত করলো।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা উকুন (قمل) প্রেরণ করলেন। এক্ষেত্রে তাফসীরকারকদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, “তা ছিলো ঘুন”। কেউ কেউ বলেন, “উকুন”। কেউ কেউ বলেন, ‘অন্য একটা ক্ষুদ্র কীট’। এসব কীট যেসব ক্ষেতের ফসল ও ফলমূল অবশিষ্ট ছিলো সবই খেয়ে ফেললো। পোশাকের মধ্যে ঢুকে পড়তো, শরীরের চামড়া কামড়াতে আরম্ভ করতো, খাদ্যের মধ্যে ভর্তি হয়ে যেতো, যদি কেউ দশ বস্তা গম চাক্কিতে পেষণের জন্য নিয়ে যেতো, তখন তা থেকে মাত্র তিন সের ফিরিয়ে আনতে পারতো। অবশিষ্ট সবটুকুই কীট গুলো খেয়ে ফেলতো। এ কীটগুলো ফির‘আউনী সম্প্রদায়ের লোকদের চুল এবং চোখের ভ্রু ও পলক পর্যন্ত খেয়ে ফেলেছিলো। শরীরের মধ্যে জল-বসন্তের দানার ন্যায় হয়ে ভরে যেতো। শয়ন করা পর্যন্ত তাদের জন্য কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। মুসিবতের
কারনে ফির‘আউনীরা আর্তনাদ করতে লাগলো। আর তারা হযরত মূসা ( عَلَیۡهِ الصَّلٰوةُ وَالسَّلَام) এর নিকট আরয করলো, “আমরা তাওবা করছি। আপনি এ ‘বালা’ অপসারিত হবার জন্য প্রার্থনা করুন।” সুতরাং সাতদিন পর এ মুসিবতও হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর দুআ’য় দূরীভূত হয়েছিলো। কিন্তু ফির‘আউনী
সম্প্রদায় আবার ওয়াদা ভঙ্গ করলো এবং পূর্বের চেয়েও অধিক খারাপ কাজে লিপ্ত হলো। একমাস শান্তিতে অতিবাহিত হবার পর হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) আবার বদ দুআ’ করলেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ‘ব্যাঙ’ পাঠালেন এবং এমন অবস্থা হলো যে, মানুষ বসতো অমনি মজলিস ব্যাঙে ভরে যেতো। কথা বলার জন্য মুখ খুলতো তখন ব্যাঙ লাফ দিয়ে মুখের মধ্যে ঢুকে পড়তো। হাড়ি-পাতিলে ব্যাঙ। খাদ্য-দ্রব্যে ব্যাঙ। চুলার মধ্যেও ব্যাঙ ভর্তি হয়ে যেতো, চুলার আগুন নিভে যেতো। বিছানায় শয়ন করলে শরীরের উপর বসে পড়তো। এ মুসিবতের কারণে ফির‘আউনীরা কেঁদে ফেললো । আর হযরত মূসা (আল্লাহ তা'আলা) এর নিকট আরয করল, “এবার আমরা পাকাপাকি তওবা করছি।” হযরত মূসা (আল্লাহ তা'আলা) তাদের নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার নিয়ে দুআ’ করলেন। সুতরাং সাতদিন পর এ মুসিবত দূরীভূত হলো। এক মাস শান্তিতে অতিবাহিত হলো। কিন্তু আবারও তারা ওয়াদা ভঙ্গ করলো এবং তাদের পূর্বের কুফরের দিকে ধাবিত হলো। হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) আবার বদ-দুআ’ করলেন।
অতঃপর সমস্ত কূপের পানি, নদীর পানি, ঝর্ণার পানি, নীল নদের পানি, মোটকথা সব ধরনের পানি তাদের জন্য তাজা রক্তে পরিণত হলো। তারা ফিরআউনের নিকট এর অভিযোগ করলো। সে জবাবে বলতে লাগলো, “হযরত মূসা যাদুর দ্বারা তোমাদের ‘নজরবন্দ’ করেছে মাত্র।” তারা বলল, “কেমন নজরবন্দী আবার? আমাদের পাত্রে তাজা রক্ত ব্যতীত পানির নাম-নিশানা পর্যন্ত নেই।” তখন ফিরআউন নির্দেশ দিলো যেন ক্বিবতী ও বনী ইসরাঈল একই পাত্র থেকে পানি নেয়। অতঃপর যখন বনী ইসরাঈল পানি উঠাতো তখন তা পানিই বের হতো। (কিন্তু) ক্বিবতীরা উঠালে সে পাত্র থেকে তাজা রক্তই বের হতো। এমনকি, ফির‘আউনী নারীগণ পিপাসায় কাতর হয়ে বনী ইসরাঈলের নারীদের নিকট আসলো আর তাদের নিকট পানি চাইলো। তখন পানি তাদের পাত্রে আসতেই তা রক্তে পরিনত হলো। তখন ফির‘আউনী নারীরা বলতে লাগলো, “তোমরা মুখে পানি নিয়ে আমাদের মুখের মধ্যে কুল্লি করো।” যতক্ষণ
পর্যন্ত সেই পানি বনী ইসরাঈলী নারীর মুখে থাকতো ততক্ষণ পানিই থাকতো। আর যখনই ফিরআউনী নারীর মুখে আসলো তখনই তা রক্তে পরিণত হয়ে গেলো।
ফির‘আউন নিজেও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লো। তখন সে ভেজা ঘাসের রস চুষতে আরম্ভ করলো। আর সে রস তার মুখে পৌঁছতেই রক্ত হয়ে গেলো। সাতদিন পর্যন্ত রক্ত ব্যতীত কারো পক্ষে কোন কিছু পান করা সম্ভবপর হয়নি। তখন তারা হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর নিকট প্রার্থনা করার জন্য দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনার প্রতিশ্রুতি দিলো। হযরত মূসা (عَلَیۡهِ السَّلَام) ও দুআ’ করলেন। এ বিপদও অপসারিত হলো কিন্তু তখনও তারা ঈমান আনেনি। (তাফসীরে খাজাইনুল ইরফান)।

No comments