পিতার বয়স ৪০, ছেলের বয়স ১১৮! কুরআনে বর্ণিত বিস্ময়কর ঘটনা।

 

পিতার বয়স ৪০, ছেলের বয়স ১১৮! কুরআনের বিস্ময়কর ঘটন

"অথবা, ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে অতিক্রম করলো একটা জনপদের উপর দিয়ে এবং তা ভেঙ্গে পড়েছিলো সেগুলোর ছাদসমূহের উপর। বললো, ‘সেটাকে কীভাবে জীবিত করবেন আল্লাহ্ সেটার মৃত্যুর পর?’ অতঃপর আল্লাহ্ তাঁকে মৃত রাখলেন একশ বছর। তারপর পূনর্জীবিত করে দিলেন। বললেন, ‘তুমি এখানে কতোকাল অবস্থান করলে?’ আরয করলো, ‘সম্ভবতঃ পূর্ণ দিন অথবা কিছু কম।’ তিনি বললেন, ‘না, তোমার উপর একশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং আপন খাদ্য-পানীয়ের প্রতি দেখো, এখনো পর্যন্ত দুর্গন্ধময় হয়নি; এবং আপন গাধার প্রতি তাকাও (যে, সেটার অস্থিগুলো পর্যন্ত সঠিক অবস্থায় থাকেনি!) এবং এটা এজন্য যে, আমি তোমাকে মানুষের জন্য নিদর্শন করবো; এবং ঐ অস্থিগুলোর প্রতি দেখো, কিভাবে সেগুলোর উত্থান প্রদান করি, অতঃপর সেগুলোকে মাংসাবৃত করি।’ যখন এ ঘটনা তাঁর নিকট সুস্পষ্ট হয়ে গেলো, (তখন) বললেন, ‘আমি খুব ভালভাবে জানি যে, আল্লাহ্ সবকিছু করতে পারেন।” (সূরা বাক্বারা,আয়াতঃ২৫৯)

________

টীকা-৫৪০ঃ অধিকাংশের মতানুসারে, এ ঘটনা হযরত ও’যায়র عَلَیۡهِ السَّلَام এর । আর ‘জনপদ’ দ্বারা ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাস’ বুঝানো হয়েছে। 

যখন ‘বোখতে নাসর’ বাদশাহ বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে ধ্বংস করলো আর বানী ইস্রাঈলকে হত্যা করলো, গ্রেফতার করলো এবং ধ্বংস করে ফেললো, অতঃপর হযরত ও’যায়র عَلَیۡهِ السَّلَام সেখানে উপনীত হলেন। তখন তঁার সাথে ছিলো এক পাত্র খেজুর ও এক পেয়ালা আঙ্গুরের রস। 

তিনি একটা গাধার পিঠে সাওয়ার ছিলেন। সমগ্র জনপদ ঘুরে ফিরে দেখলেন, কোন মানুষ-জনের দেখা পেলেন না। বস্তির ইমারতসমূহ ধ্বংসস্তুপে পরিণত দেখলেন। সুতরাং তিনি আশ্চার্যন্বিত হয়ে বললেন,اَنّٰی یُحۡیٖ ہٰذِہِ  اللّٰہُ بَعۡدَ مَوۡتِہَا (অর্থাৎ কিভাবে এ বস্তিকে সেটার মৃত্যুর পর জীবিত করবেন।) 

অতঃপর তিনি তাঁর আরোহনের গাধাটা সেখানে বেঁধে রাখলেন এবং বিশ্রামরত হলেন। এমতাবস্থায় তাঁর রূহ কবজ করে নেয়া হলো আর গাধাটাও মরে গেলো। এটা সকাল বেলার ঘটনা। এর সত্তর বছর পর আল্লাহ্ তাআ’লা পারস্যের বাদশাহদের মধ্য থেকে একজন বাদশাহকে বিজয় দান করলেন। তিনি 

তাঁর সৈন্যদল নিয়ে ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাস’ পৌঁছলেন এবং সেটাকে পূর্বাপেক্ষাও উত্তমরূপে আবাদ করলেন আর বানী ইস্রাঈলের যেসব বেঁচে ছিলো আল্লাহ্ তাআ’লা তাদেরকে পুনরায় সেখানে নিয়ে এলেন। তারা বায়তুল মুক্বাদ্দাস ও সেটার চতুষ্পার্শে তাদের বসতি স্থাপন করলো এবং তাদের সংখ্যাও বাড়তে লাগলো। 

সে যুগে আল্লাহ্ তাআ’লা হযরত ও’যায়র عَلَیۡهِ السَّلَام কে দুনিয়াবাসীর চোখের অন্তরালে রাখলেন। কেউই তাঁকে দেখতে পায়নি। যখন তাঁর ওফাতের পর একশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো তখন আল্লাহ্ তাআ’লা তাঁকে জীবিত করলেন। প্রথমে চক্ষুদ্বয়ে প্রাণ আসলো। তখনো সারা শরীর প্রাণহীন ছিলো। তাও তাঁর চোখের সামনে জীবন্ত করা হলো। এ ঘটনা অপরাহ্নে সূর্যাস্তের পূর্বেই সংঘটিত হলো। আল্লাহ্ তাআ’লা ইরশাদ করলেন, “তুমি এখানে কতদিন অবস্থান করলে?” তিনি অনুমান করে আরয করলেন, “একদিন অথবা কিছু কম।’ তাঁর মনে হলো যে, সেটা ঐ দিনেরই বিকেল বেলা, যেদিন সকালে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ইরশাদ করলেন, “বরং তুমি শত বছর অবস্থান করেছো। আপন খাদ্য ও পানীয় অর্থাৎ খেজুর ও আঙ্গুর-রসের প্রতি লক্ষ্য করো;তা অবিকৃতই রয়েছে। তাতে দুর্গন্ধ পর্যন্ত আসেনি। আর নিজ গাধার প্রতি দেখো।” দেখলেন, সেটা ছিলো মৃত গলিত। দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গও বিক্ষিপ্ত ছিলো। 

অস্থিগুলোর শুভ্রতা চমকাচ্ছিলো। তাঁরই চোখের সামনে অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো একত্রিত হলো। সেগুলো আপন আপন স্থানে এসে জড়ো হলো। অস্থিগুলোর উপর মাংস ভরে উঠলো। মাংসের উপর চামড়া আসলো, লোম গজালো। অতঃপর তাতে রূহ ফুঁকলো। সেটা উঠে দাঁড়ালো এবং ডাক হাঁকতে আরম্ভ করলো। তিনি (হযরত ও’যায়র) আল্লাহ্ তাআ’লার ক্বুদরত প্রত্যক্ষ করলেন আর বললেন, “আমি খুব ভালভাবেই জানি যে, আল্লাহ্ তাআ’লা সব কিছু করতে পারেন।” 

অতঃপর তিনি ঐ সাওয়ারীর উপর আরোহণ করে আপন মহল্লায় তাশরীফ নিয়ে গেলেন। পবিত্র মাথার চুল ও দাঁড়ি মুবারক সাদা ছিলো। বয়স ছিলো ঐ চল্লিশ বছর। কেউ তাঁকে চিনতে পারলোনা। তিনি অনুমান করে আপন বাসস্থানে পৌঁছলেন। সেখানে একজন দুর্বল বৃদ্ধা দেখতে পেলেন, তার পা গুলো অকেজো ছিলো। সে দৃষ্টি শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলো। সে তাঁর ঘরের দাসী ছিলো। তাঁকে সে দেখেছিলো। তিনি তাকে (বৃদ্ধাকে) বললেন, “এটা কি ও’যায়ের বাসস্থান?” সে বললো, “হ্যাঁ” তিনি বললেন, “ও’যায়র কোথায়” বললো, “তিনি নেই, হারিয়ে গেছেন আজ একশ বছর গত হয়েছে।” একথা বলে সে খুব কান্নাকাটি করলো। তিনি বললেন, “আমি ও’যায়র।” সে বললো, سُبۡحٰنَ اللّٰه! তা কিভাবে হতে পারে।?” তিনি বললেন, “আল্লাহ্ তাআ’লা আমাকে একশ বছর মৃতাবস্থায় রেখেছেন অতঃপর পূনর্জীবিত করেছেন।” সে বললো, “হযরত ও’যায়র ‘মুস্তাজাবুদ্দা’ওয়াত’ ছিলেন। তিনি যা দুআ’ করতেন, আল্লাহর দরবারে তা কবূল হতো। আপনিও দুআ’ করুন যেন আমি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পাই, যাতে আমি আপন চোখেই আপনাকে দেখতে পারি।” তিনি দুআ’ করলেন। সে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পেলো। তিনি তার হাত ধরে বললেন, “উঠ্! আল্লাহ্ এর নির্দেশে।” একথা বলতেই তার বিকল পা-দু’টি সুস্থ হয়ে গেলো। সে তাঁকে দেখতেই চিনতে পারলো আর বললো, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে ও’যায়র।” 

সে তাঁকে বনী ইস্রাঈলের মহল্লায় নিয়ে গেলো। সেখানে এক মজলিসে তাঁর সন্তান উপস্থিত ছিলেন; যাঁর বয়স একশ আঠার বছর ছিলো। তাঁর পৌত্রেরাও ছিলো, যারা বার্দ্ধক্যে পৌঁছেছিলো। বৃদ্ধা মজলিসে আহ্বান করে বললো, “ইনি হযরত ও’যায়র তাশরীফ এনেছেন।” মজলিসে উপস্থিত লোকজন অস্বীকার করলো। সে (বৃদ্ধা) বললো, “আমাকে দেখো! তাঁরই দুআ’য় আমি (সুস্থ হয়ে) এমতাবস্থায় এসেছি।” 

লোকেরা উঠে তাঁর নিকট এলো। তাঁর সন্তান বললেন, “আমার সম্মানিত পিতার দু’স্কন্ধের মধ্যভাগে কালো চুলের একটা ‘চন্দ্রাকৃতি’ শোভা পেতো।” শরীর মুবারক খুলে দেখানো হলো। তখন সেটা পাওয়া গেলো। 

সেই যুগে তাওরীতের কোন কপি ছিলোনা। সেটার জ্ঞানসম্পন্ন তখন কেউ মওজুদ ছিলোনা। তিনি সমগ্র তাওরীত মুখস্ত পড়ে শুনালেন। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠলো, “আমি আমার পিতার নিকট জানতে পেরেছি যে, ‘বোখতে নাসর’ এর যুলুম- অত্যাচারের পর গ্রেফতারীর যুগে আমার দাদা তাওরীত 

একস্থানে দাফন করেছিলেন। সেটার ঠিকানা আমার জানা আছে। ঐ স্থানে তালাশ করার পর তাওরীতের ঐ দাফনকৃত কপি উদ্ধার করা হলো । আর হযরত ও’যায়র (عَلَیۡهِ السَّلَام) আপন স্মৃতির সাহায্যে যেই তাওরীত লিপিবদ্ধ করেছিলেন সেটার সাথে মিলিয়ে দেখা হলো। উভয়ের মধ্যে একটা অক্ষরেরও পার্থক্য ছিলোনা। (জুমাল) (তাফসীরে খাজাইনুল ইরফান)। 

No comments

Powered by Blogger.