আদ সম্প্রদায়ের ধবংসের কাহিনী
সংক্ষিপ্ত ঘটনাঃ ‘আদ সম্প্রদায়’ ‘আহক্বাফ’-এ বসবাস করতো, যা ওমান ও হাদারা মাউত-এর মধ্যবর্তী ইয়েমেনী এলাকার একটা মরুভুমি ছিলো। তারা ভূ-পৃষ্ঠকে অপকর্মে ভর্তি করে দিয়েছিলো। দুনিয়ার অন্যান্য সম্প্রদায়কে তারা অত্যাচার ও শক্তির দাপটে পদদলিত করেছিলো। তারা মূর্তিপূজারী ছিলো।
তাদের একটা মূর্তির নাম ছিলো ‘সাদা’ (صداء), একটা নাম ছিল ‘সামূদ’ (صمود) এবং একটা নাম ছিলো ‘হাবা’ (هباء)।
আল্লাহ তাআ’লা তাদের মধ্যে হযরত হূদ (عَلَیۡهِ السَّلَام) কে প্রেরণ করলেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর একত্বকে স্বীকার করে নেয়ার নির্দেশ দিলেন।
শির্ক, মূর্তিপূজা এবং যুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিলেন। ঐসব লোক তা মান্য করতে অস্বীকৃতি জানালো এবং তাঁকে অস্বীকার করতে লাগলো। অধিকন্তু বলতে লাগলো, “আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী কে আছে?” মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন মাত্র তাদের মধ্য থেকে হযরত হূদ (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর উপর ঈমান আনলেন। তাঁরা সংখ্যায় অতি স্বল্প ছিলেন এবং নিজেদের ঈমানকে গোপন করে রাখতেন। ঐসব ঈমানদারদের মধ্যে একজনের নাম ছিলো ‘মারসাদ ইবনে সা‘আদ ইবনে ‘উদায়র’ (مرشد بن سعد بن عضیر)। তিনি স্বীয় ঈমানকে গোপন রাখতেন।
যখন সম্প্রদায়ের লোকেরা অবাধ্যতা প্রদর্শন করলো, তাদের নবী হযরত হূদ (عَلَیۡهِ السَّلَام) কে অস্বীকার করলো, দুনিয়ায় ফ্যাসাদ আরম্ভ করলো, যুলুম অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করতে লাগলো এবং অতি উচ্চ ও মজবুত অট্টালিকা নির্মাণ করলো- মনে হচ্ছিলো যেন তারা এ কথাই বিশ্বাস করতো যে, তারা এ দুনিয়ায় চিরদিনই থাকবে; যখন তাদের অপরাধ এ পর্যায়ে পৌঁছলো, তখন আল্লাহ তাআ’লা বৃষ্টি বন্ধ করে দিলেন। তিন বছর যাবত বৃষ্টিপাত হয়নি। তখন তারা মহাবিপদে পড়লো।
সে যুগে একটা প্রথা ছিলে যে, যখন বালা-মুসিবত অবতীর্ণ হতো তখন লোকেরা পবিত্র কা’বা গৃহে হাযির হয়ে আল্লাহ তাআ’লার দরবারে সেই মুসিবত দূরীভূত করার জন্য প্রার্থনা করতো।
এজন্য তারাও একদল প্রতিনিধি ‘বাইতুলাহ শরীফ‘ রওনা করলো। এ প্রতিনিধি দলের মধ্যে ক্বায়ল ইবনে আনায, না‘ঈমান ইবনে বায়াস এবং মারসাদ ইবনে সা‘আদও ছিলো। তারা ঐসব লোক ছিলেন, যারা হযরত হূদ (عَلَیۡهِ السَّلَام) এর উপর ঈমান এনেছিলো এবং স্বীয় ঈমানকে গোপন করতো।সে যুগে মক্কা মুকাররমায় ‘আমালীক্ব’ (সম্প্রদায়) বসবাস করতো। তাদের নেতা ছিলো মু‘আবিয়া ইবনে বাকার। তার নানা-সম্পর্কীয় আত্মীয় স্বজন ‘আদ গোত্রের মধ্যে ছিলো। সেই এলাকা থেকে প্রতিনিধি দলটা মক্কা মুকাররমার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুআ’বিয়া ইবনে বাকারের বাড়িতে অবস্থান গ্রহণ করলো।
সেসব লোকের যথেষ্ট সমাদর করলো, অতিমাত্রায় আতিথিয়েতা করলো। এখানে এসব লোক মদ্য পান করতে এবং দাসীদের নৃত্য উপভোগ করতে লাগলো। এভাবে তারা আরাম-আয়েশ ভোগ-বিলাসের মধ্যে পূর্ণ একটা মাস অতিবাহিত করলো। তখন মু‘আবিয়া মনে মনে এ কথা ভাবলো যে, এসব লোকতো আরাম-আয়েশের নেশায় এমনি মত্ত হয়ে গেছে যে, নিজেদের গোত্রের ঐ বিপদের কথা পর্যন্ত ভুলে বসেছে, যাতে তারা সেখানে আটকা পড়েছে। কিন্তু মু‘আবিয়া ইবনে বাকারের এ ধারণাও ছিলো যে, যদি সে ওই সব লোককে কিছু বলে তবে তারা সম্ভবত এ কথা মনে করতে পারে যে, ‘এখন তাদের আতিথেয়তা তার নিকট কষ্টদায়ক অনুভূত হচ্ছে।’ এ কারণে সে গায়িকা দাসীদেরকে এমন সব কবিতা পাঠের নির্দেশ দিলো, ‘যে গুলোর মধ্যে আদ গোত্রের দুর্ভিক্ষের উল্লেখ ছিলো। দাসীরা যখন উক্ত সব কবিতা পাঠ করলো, তখন তাঁদের স্মরণ হলো, “আমরা তো ঐ গোত্রীয়দের বিপদের কথা ফরিয়াদ করার উদ্দেশ্যে মক্কা মুকাররমায় প্রেরিত হয়েছি।”
অতএব, তারা তখনই হেরম শরীফে প্রবেশ করে তাদের সম্প্রদায়ের উপর বৃষ্টি বর্ষণের জন্য প্রার্থনা করার মনস্থ করলো। তখন মারসাদ ইবনে সা‘আদ বললেন, “আল্লাহর শপথ, তোমাদের প্রার্থনায় বৃষ্টি বর্ষিত হবে না; কিন্তু যদি তোমরা তোমাদের নবীর কথা মেনে চলো তবে বৃষ্টিপাত হবে।” তখনই মারসাদ স্বীয় ‘ইসলাম’ প্রকাশ করলো। এসব লোক মারসাদকে ত্যাগ করলো এবং নিজেরা মক্কা মুকাররমায় গিয়ে প্রার্থনা করলো। আল্লাহ তাআ’লা তিনটা মেঘ প্রেরণ করলেন- একটা সাদা, একটা লাল এবং একটা কালো। আর আসমান থেকে আহবান আসলো- “হে ক্বায়ল! নিজের জন্য ও নিজ সম্প্রদায়ের জন্য এ মেঘগুলো থেকে যে কোন একটা মেঘকে গ্রহন করো।” সে কালো বর্ণের মেঘকে গ্রহন করলো, এ ধারণায় যে, তা থেকে খুব বেশি পানি বর্ষিত হবে।
অতঃপর সেই কালো মেঘ ‘আদ গোত্রের দিকে রওনা হলো এবং ওসব লোক তা দেখে খুব খুশি হলো। কিন্তু তা থেকে এক বাতাস প্রবাহিত হলো। তা এত প্রবল ছিলো যে, মোটা মানুষকে উড়িয়ে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলো! এটা দেখে ঐসব লোক আপন আপন ঘরে ঢুকে পড়লো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো, কিন্তু তারা বাতাসের তীব্রতা থেকে বাঁচতে পারেনি। বাতাস দরজাগুলো উৎপাটিত করলো এবং তাদেরকে ধ্বংস করে ফেললো। আর আল্লাহর ক্বুদরতে, কালো বর্ণের পাখি আত্মপ্রকাশ করলো, যেগুলো তাদের লাশগুলোকে উঠিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলো, হযরত হূদ (عَلَیۡهِ السَّلَام) মু’মিনদেরকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রদায় থেকে পৃথক হয়ে সরে গিয়েছিলেন। একারণে, তাঁরা নিরাপদে ছিলেন। সম্প্রদায়ের লোকেরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার পর ঈমানদারগণকে সঙ্গে নিয়ে হযরত হূদ (عَلَیۡهِ السَّلَام) মক্কা মুকাররমায় তাশরীফ নিয়ে গেলেন এবং পবিত্র জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেখানে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করতে থাকেন।
(তাফসীরে খাজাইনুল ইরফান)

No comments